আইন কমিশন আইন, ১৯৯৬
আইন কমিশন প্রতিষ্ঠাকল্পে প্রণীত আইন।
আইন কমিশন প্রতিষ্ঠাকল্পে প্রণীত আইন। যেহেতু দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থার পরিবর্তন, মুক্ত বাজার অর্থনীতির প্রবর্তন ও বিভিন্ন আদালতে বহুসংখ্যক মামলা দীর্ঘদিন বিচারাধীন থাকার পরিপ্রেক্ষিতে এবং মৌলিক মানবাধিকার পরিস্থিতির আইনগত দিকসমূহ পুনরীক্ষণ ও আইন শিক্ষার মানোন্নয়নসহ অন্যান্য জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদি সম্পর্কে বিধান করার লক্ষ্যে অচল আইনসমূহ বাতিল, প্রচলিত অন্যান্য আইনসমূহ পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও উহাদের যুগোপযোগী সংস্কার অথবা ক্ষেত্রমত নূতন আইন প্রণয়ন করার উদ্দেশ্যে সরকারের নিকট সুপারিশ পেশ করার জন্য একটি স্থায়ী আইন কমিশন প্রতিষ্ঠা করা সমীচীন ও প্রয়োজন; সেহেতু এতদ্দ্বারা নিম্নরূপ আইন করা হইল:-
সংক্ষিপ্ত শিরোনামা
১৷ এই আইন আইন কমিশন আইন, ১৯৯৬ নামে অভিহিত হইবে৷
সংজ্ঞা
২৷ বিষয় বা প্রসংগের পরিপন্থী কোন কিছু না থাকিলে, এই আইনে,-
কমিশন প্রতিষ্ঠা
৩৷ এই আইনের উদ্দেশ্য পূরণকল্পে আইন কমিশন নামে একটি কমিশন থাকিবে৷
কমিশনের কার্যালয়
৪৷ কমিশনের কার্যালয় ঢাকায় থাকিবে৷
কমিশন গঠন
৫৷ (১) একজন চেয়ারম্যান এবং দুইজন সদস্য-সমন্বয়ে কমিশন গঠিত হইবে এবং সরকার প্রয়োজন মনে করিলে উহার সদস্য-সংখ্যা বৃদ্ধি করিতে পারিবে৷
(২) কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্যগণ সরকার কর্তৃক নিযুক্ত হইবেন এবং তাঁহাদের নিয়োগ ও চাকুরীর শর্তাবলী সরকার কর্তৃক নির্ধারিত হইবে৷
(৩) উপ-ধারা (৪) এর বিধানাবলী সাপেক্ষে, চেয়ারম্যান ও সদস্যগণ তাঁহাদের নিয়োগের তারিখ হইতে তিন বত্সর মেয়াদে স্ব স্ব পদে অধিষ্ঠিত থাকিবেন:
তবে শর্ত থাকে যে, উক্ত মেয়াদ অতিবাহিত হইবার পর, সরকার যথাযথ বিবেচনা করিলে, চেয়ারম্যান বা কোন সদস্যকে নির্ধারিত সময়কালের জন্য পুনর্নিয়োগ করিতে পারিবে৷
(৪) সরকারের উদ্দেশ্যে স্বাক্ষরযুক্ত পত্রযোগে চেয়ারম্যান বা কোন সদস্য স্বীয় পদ ত্যাগ করিতে পারিবেন; এবং যদি সরকার এই মর্মে সন্তুষ্ট হয় যে, চেয়ারম্যান বা কোন সদস্য গুরুতর অসদাচরণ কিংবা শারীরিক বা মানসিক অক্ষমতার কারণে তাঁহার পদে বহাল থাকার অযোগ্য হইয়া পড়িয়াছেন, তাহা হইলে সরকার যে কোন সময় তাঁহাকে তাঁহার পদ হইতে অপসারণ করিতে পারিবে:
তবে শর্ত থাকে যে, শুনানীর যুক্তিসংগত সুযোগ প্রদান না করিয়া এই উপ-ধারার অধীনে চেয়ারম্যান বা কোন সদস্যকে তাঁহার পদ হইতে অপসারণ করা যাইবে না৷
(৫) চেয়ারম্যানের পদ শূন্য হইলে কিংবা অনুপস্থিতি, অসুস্থতা বা অন্য কোন কারণে তিনি তাঁহার দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হইলে, শূন্য পদে নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান কার্যভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত কিংবা চেয়ারম্যান পুনরায় স্বীয় দায়িত্ব পালনে সমর্থ না হওয়া পর্যন্ত সরকার কর্তৃক মনোনীত কোন সদস্য চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করিবেন৷
(৬) শুধুমাত্র চেয়ারম্যান বা কোন সদস্য-পদে শূন্যতা বা কমিশন গঠনে ত্রুটি থাকিবার কারণে কমিশনের কোন কার্য বা কার্যধারা অবৈধ হইবে না এবং তত্সম্পর্কে কোন বৈধতার প্রশ্নও উত্থাপন করা যাইবে না৷
অবৈতনিক সদস্য
[৫ক৷ সরকার অনূর্ধ্ব তিন বত্সর মেয়াদের জন্য কমিশনের এক বা একাধিক অবৈতনিক সদস্য নিয়োগ করিতে পারিবে এবং কমিশনের কার্যাবলী সম্পাদনের জন্য তাহাদিগকে প্রদেয় সুযোগ-সুবিধা নির্ধারণ করিবে৷]
কমিশনের কার্যাবলী
৬৷ কমিশনের কার্যাবলী হইবে-
ত্বরান্বিত করার এবং ন্যায় বিচার যথাসম্ভব দ্রুত নিশ্চিত করার লক্ষ্যে-
(১) সংশ্লিষ্ট আইনসমূহ পরীক্ষা-নিরীক্ষান্তে উহাদের সংশোধন বা ক্ষেত্রমত নূতন আইন প্রণয়নের সুপারিশ করা;
(২) বিচার ব্যবস্থা আধুনিকীকরণের জন্য উহার প্রয়োজনীয় সংস্কারের সুপারিশ করা;
(৩) বিচার ব্যবস্থার সহিত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ অর্থাত্ বিচারবিভাগীয় কর্মকর্তা-কর্মচারী, আইন কর্মকর্তা ও আইনজীবীগণের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য প্রশিক্ষণ ও অন্যান্য পদক্ষেপের সুপারিশ করা;
(৪) সামগ্রিকভাবে বিচার ব্যবস্থা এবং বিশেষতঃ সংশ্লিষ্ট আইনের অপব্যবহার রোধকল্পে প্রয়োজনীয় সুপারিশ করা;
(৫) আদালত ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন দিক, যথা, বিচারকদের মধ্যে কার্যবণ্টন, নকল সরবরাহ, নথি প্রেরণ ও সংরক্ষণ, নোটিশাদি জারী ও অন্যান্য প্রাসঙ্গিক বিষয় আধুনিকীকরণ সম্পর্কে সুপারিশ করা;
(৬) ফৌজদারী মামলার অভিযোগ তদন্ত করিবার জন্য স্বতন্ত্র তদন্তকারী সংস্থা প্রতিষ্ঠার এবং সরকারের পক্ষে বিভিন্ন মামলা সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য বর্তমান ব্যবস্থার পরিবর্তে একটি অধিকতর দক্ষ এবং জবাবদিহিতামূলক ব্যবস্থা প্রবর্তনের সম্ভাব্যতা যাচাই করতঃ তত্সম্পর্কে গ্রহণীয় পদক্ষেপের সুপারিশ করা;
(১) শিল্প ও বাণিজ্য ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ সৃষ্টির এবং একচেটিয়া আধিপত্য পরিহারের উদ্দেশ্যে কোম্পানী আইনসহ সংশ্লিষ্ট আইনসমূহ সংশোধন বা ক্ষেত্রমত নূতন আইন প্রণয়নের সুপারিশ করা;
(২) সংশ্লিষ্ট অন্যান্য আইন বিশেষতঃ কপিরাইট, ট্রেড মার্ক, পেটেন্ট, আরবিট্রেশন, চুক্তি, রেজিষ্ট্রেশন এবং অনুরূপ অন্যান্য বিষয়াদি সংক্রান্ত আইনসমূহ পরীক্ষান্তে সুপারিশ করা;
(৩) বাণিজ্য এবং ব্যাংক ঋণ বিষয়ক মামলা নিষ্পত্তির জন্য পৃথক আদালত স্থাপনের বিষয় পরীক্ষান্তে প্রয়োজনীয় সুপারিশ করা;
কর্ম পরিকল্পনা
[৬ক৷ (১) কমিশন তদকর্তৃক সম্পাদিতব্য প্রতি দুই বত্সরের একটি কর্ম পরিকল্পনা পূর্ববর্তী বত্সরের ৩০শে সেপ্টেম্বরের মধ্যে সরকারের নিকট পেশ করিবে৷
(২) উপ-ধারা (১) এর অধিন প্রাপ্ত কর্ম পরিকল্পনার বিষয়াবলীর উপর সরকার উহার মতামত বা সুপারিশ, যদি থাকে, উক্ত বত্সরের ৩০শে নভেম্বর এর মধ্যে কমিশন বরাবরে প্রেরণ করিবে৷
(৩) উপ-ধারা (২) এর অধীন সরকারের মতামত বা পরামর্শ বিবেচনাক্রমে কমিশন কর্ম পরিকল্পনাটি চূড়ান্ত করিয়া উক্ত বত্সরের ৩১শে ডিসেম্বরের মধ্যে সরকারকে অবহিত করিবে৷
(৪) এই ধারার বিধানাবলী ধারা ৬ এর অধীন কমিশন কর্তৃক কার্য সম্পাদনের ক্ষেত্রে বাঁধা হিসাবে গণ্য হইবে না৷]
গবেষণা ইত্যাদি
৭৷ (১) কমিশন উহার কার্যাবলী সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনের জন্য উহার বিবেচনায় প্রয়োজনীয় যে কোন গবেষণা বা অনুসন্ধানকার্য পরিচালনা করিতে পারিবে এবং তত্কর্তৃক প্রণীত বিভিন্ন প্রশ্নের উপর মতামত সংগ্রহ করিতে পারিবে৷
(২) উপ-ধারা (১) এ উল্লিখিত গবেষণা বা অনুসন্ধানকার্য পরিচালনাকালীন সময়ে প্রত্যেক ব্যক্তি কমিশনকে যথাসম্ভব সহায়তা দান করিবেন এবং কমিশন কর্তৃক প্রণীত প্রশ্নের উপর মতামত প্রদান করিবেন৷
(৩) এই ধারার অধীন কোন অনুসন্ধানকার্য পরিচালনা বা কমিশন কর্তৃক প্রণীত কোন প্রশ্নের উপর মতামত সংগ্রহের বিষয়ে কমিশন সেই সকল ক্ষমতা প্রয়োগ করিতে পারিবে যে সকল ক্ষমতা কোন দেওয়ানী আদালত Code of Civil Procedure, 1908 (Act V of 1908) এর অধীন উক্ত বিষয়সমূহের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করিতে পারে, যথা:-
(৪) এই আইন বা আপাততঃ বলবত্ অন্য কোন আইনে যাহা কিছুই থাকুক না কেন, এই ধারার অধীন পরিচালিত অনুসন্ধানকার্য এবং সংগৃহীত তথ্য ও মতামতের ভিত্তিতে প্রণীত সুপারিশ প্রণয়নকার্য আধা-বিচার বিভাগীয় কার্য বলিয়া গণ্য হইবে৷
গবেষণা কর্মকর্তা
[৭ক৷ (১) কমিশনের প্রয়োজনীয় সংখ্যক সিনিয়র গবেষণা কর্মকর্তা থাকিবে এবং তাঁহাদের চাকুরীর শর্তাবলী বিধিদ্বারা নির্ধারিত হইবে৷
(২) সিনিয়র গবেষণা কর্মকর্তাগণ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, আইন বিষয়ে এম. িফল/পি.এইচডি বা সমমানের ডিগ্রিধারী অথবা লেজিসলেটিভ ড্রাফটিং-এ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের মধ্য হইতে নিয়োগপ্রাপ্ত হইবেন এবং
কমিশনের গবেষণা কার্যে অন্যুন ১০ বত্সরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন সিনিয়র গবেষণা কর্মকর্তাগণ কমিশনের সদস্য হিসাবে নিয়োগ লাভের যোগ্যতা অর্জন করিবেন৷
(৩) কমিশন যদি এই মর্মে সন্তুষ্ট হয় যে, এই ধারার উদ্দেশ্য পূরণকল্পে কোন বিষয়ে গবেষণা বা অনুসন্ধান কার্য পরিচালনা করা সমীচীন ও প্রয়োজনীয়, তাহা হইলে কমিশন কর্তৃক এতদুদ্দেশ্যে যোগ্য বিবেচিত কোন ব্যক্তিকে সরকার, তদ্কর্তৃক নির্ধারিত শর্তে, পরামর্শক হিসাবে নিয়োগ করিতে পারিবে৷
(৪) কমিশন উহার গবেষণা কার্যে আবশ্যক মনে করিলে, সংশ্লিষ্ট গবেষণা কার্যে অভিজ্ঞতা রহিয়াছে প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত এমন কোন ব্যক্তিকে কমিশন অনূর্ধ্ব ৩০ দিনের জন্য উহার অধীনে ন্যস্ত করিতে সরকারকে অনুরোধ করিতে পারিবে এবং সরকার উক্তরূপ অনুরোধ বিবেচনাক্রমে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করিবে৷
সহায়তা ইত্যাদি
৭খ৷ কমিশনের কার্যাবলী সুষ্ঠুভাবে সম্পাদন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সহায়তা প্রদানের জন্য কমিশন সরকারকে অনুরোধ করিতে পারিবে এবং সরকার উক্তরূপ অনুরোধ বিবেচনাক্রমে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করিবে৷]
কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগ
[৮৷ (১) কমিশনের কার্যাবলী সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনের ব্যাপারে সহায়তা দান করার জন্য সরকার তদকর্তৃক অনুমোদিত পদে বিধি দ্বারা নির্ধারিত পদ্ধতিতে কর্মকর্তা এবং কমিশন প্রবিধান দ্বারা নির্ধারিত পদ্ধতিতে অন্যান্য কর্মচারী নিয়োগ করিবে৷
(২) উপ-ধারা (১) এ যাহা কিছুই থাকুক না কেন, শ্রেণী নির্বিশেষে যে কোন টেকনিক্যাল পদে কমিশন অনধিক ছয় মাসের জন্য এড্-হক ভিত্তিতে নিয়োগ দান করিতে পারিবে৷]
প্রতিবেদন দাখিল
৯৷ (১) প্রত্যেক বত্সরের ১লা মার্চের মধ্যে কমিশন পূর্ববর্তী বত্সরের সম্পাদিত কার্য সম্পর্কে একটি প্রতিবেদন সরকারের নিকট দাখিল করিবে এবং সরকার তাহা সংসদে পেশ করিবার ব্যবস্থা করিবে৷
(২) কমিশন কোন বিষয়ে উহার সুপারিশ প্রণয়ন সম্পন্ন করিলে অবিলম্বে তত্সম্পর্কে উহার চূড়ান্ত প্রতিবেদন সরকারের নিকট দাখিল করিবে [এবং সরকার প্রতি বত্সরের সংসদের প্রথম অধিবেশনে কমিশনের রিপোর্ট বাস্তবায়ন সম্পর্কিত একটি প্রতিবেদন সংসদে পেশ করিবে]৷
বিধি প্রণয়নের ক্ষমতা
[৯ক৷ এই আইনের উদ্দেশ্য পূরণকল্পে সরকার, সরকারী গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা, বিধি প্রণয়ন করিতে হইবে৷]
প্রবিধান প্রণয়নের ক্ষমতা
১০৷ এই আইনের উদ্দেশ্য পূরণকল্পে কমিশন, সরকারের পূর্বানুমোদনক্রমে এবং সরকারী গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা, এই আইনের সহিত অসামঞ্জস্যপূর্ণ না হয় এইরূপ প্রবিধান প্রণয়ন করিতে পারিবে৷
ইংরেজীতে অনুদিত পাঠ প্রকাশ
[১০ক৷ সরকার, সরকারী গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা, এই আইনের ইংরেজীতে অনুদিত একটি নির্ভরযোগ্য পাঠ প্রকাশ করিবে, যাহা এই আইনের অনুমোদিত ইংরেজী পাঠ (Authentic English Text) নামে অভিহিত হইবে:
তবে শর্ত থাকে যে, এই আইন ও উক্ত ইংরেজী পাঠের মধ্যে বিরোধের ক্ষেত্রে এই আইন প্রাধান্য পাইবে৷]
রহিতকরণ ও হেফাজত
১১৷ (১) আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ২৪শে চৈত্র, ১৪০০ বাং মোতাবেক ৭ই এপ্রিল, ১৯৯৪ ইং তারিখের রিজলিউশন নং ১২০ আইন/ভেটিং ৩৩/৯৩, অতঃপর উক্ত রিজলিউশন বলিয়া উল্লিখিত, এতদ্বারা রহিত করা হইল৷
(২) উক্ত রিজলিউশন রহিত হইবার সংগে সংগে-